১২ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং ।। বৃহস্পতিবার ।। ২৭শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ ।। নিবন্ধনের জন্য তথ্য মন্ত্রণালয় আবেদনকৃত অনলাইন পত্রিকা www.jhalokathisomoy.com

সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ছাড়া যে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ সাইটের তথ্য, ছবি বা ভিডিও প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবেন-সম্পাদক

মুক্তিযুদ্ধ, পেয়ারা বাগান এবং সম্ভাবনা

থ্যাইল্যান্ডের ফ্লোটিং মার্কেট কিংবা কেরেলার ব্যাক ওয়াটার ট্রিপ নয়, পেয়ারাসহ সবজি কেনা বেচাকে কেন্দ্র করে ঝালকাঠি সদর উপজেলার কীর্তিপাশা ইউনিয়নের ভীমরুলিতে জমে ওঠেছে ভাসমান বাজার। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো দর্শনার্থী আসছেন দলে দলে। বিশেষ করে বর্ষায় পেয়ারার ভাসমান হাট-বাজারকে কেন্দ্র করে।
ঝালকাঠি সদর উপজেলার কম করে হলেও ১৫ টি গ্রামে ৫০০ হেক্টর জমিতে পেয়ারার চাষ হয়। শত বছর ধরে বংশানুক্রমেই এখানকার হাজার হাজার মানুষ কান্দি বা সজ্জন পদ্ধতিতে পেয়ারা চাষ করে আসছেন। বছরের প্রায় ১২ মাসই এ অঞ্চলটি পানি দ্বার বেষ্টিত থাকে। শ্রাবণ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত এসব গ্রামগুলোতে ভাসমান হাটে পেয়ারা বেচাকেনা চলে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসব ভাসমান হাট থেকে পেয়ারা কিনে নিয়ে যান।আরও ছোট ছোট কয়েকটি ভাসমান হাট রয়েছে। তবে সেগুলোর মধ্যে ঝালকাঠি সদর উপজলোর র্কীতিপাশা ইউনিয়নের ভীমরুলি গ্রামের ভীমরুলি খালের ওপরের ভাসমান হাটটি সবচে বড়। পেয়ারা ছাড়াও বছররে বারমাস ভাসমান এ হাটে কেনা বেচা হয় স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদতি অন্যান্য কৃষি পণ্যও। পেয়ারাকে কেন্দ্র করে শ্রাবণ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত ভাসমান হাটটি সবচে বেশি জমে ওঠে। এ সময় ক্রেতা বিক্রেতা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো পর্যাটক আসেন ভাসমান বাজারের মনোরম দৃশ্য দেখতে। আসতে শুরু করেছেন বিদেশীরাও। এখানে এখনও তৈরি হয়নি পর্যাটকদের জন্য কোন বিশ্রামাগার। বাথরুম টয়লেট পেলে গ্রামবাসীর বাড়ি গিয়ে প্রার্থণা জানাতে হবে। গ্রামবাসী এমনিতেই বহু বছর ধরে অভ্যস্থ হয়ে গেছে, তেমন একটা বিরক্ত হবে না। খাবারের জন্য যেসব হোটেল রেস্তোরা এখানে মিলেছে তা ভাল মানের নয়। তবে চালিয়ে নেয়ার মত খাবার পাওয়া যাবে। চা-পান, সিগারেট, মিনারেল ওয়াটার এই সব পাওয়া যাবে। দেশি ফল খেতে পারেন গ্রামের হাটেই।
ভীমরুলি গ্রামের মধ্যবর্তী এলাকা দিয়ে প্রধান খালটি বয়ে চলেছে। খাল পাড়েও রয়েছে বাজার। পাশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক দুটি স্কুল। পেয়ারা মৌসুমে দেখা যাবে, পেয়ারা কিছু তরুণ প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা উচ্চ শব্দে মাইক বাঁজিয়ে ভাসমান হাটে নৌ-ভ্রমনে আসছে। প্রাকৃতিক পরিবেশ বিঘœ হচ্ছে এতে। কেনা বেচায়ও বিঘœ ঘটেছে। অসুবিধা হচ্ছে পার্শ্ববর্তী স্কুলের পাঠদানেও। তাই আমার মনে হয় পর্যাটকদের জন্য নীতিমালা করা দরকার। যাহোক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে থ্যাইল্যান্ডের ফ্লোটিং মার্কেট কিংবা কেরেলার ব্যাক ওয়াটার ট্রিপের মতই সম্ভাবনা রয়েছে ঝালকাঠির ভীমরুলির পেয়ারার হাটটির। দেশের পর্যাটকদের পাশাপাশি বিদেশী পর্যাটকদেরও দৃষ্টি আর্কষণ করতে শুরু করেছে এটি। পেয়ারা মৌসুমে এখানে প্রতিদিন হাজারখানেক পর্যাটকের আনাগোনা হয়।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই পেয়ারা বাগানের চির স্মরণীয়, শোকের আর গর্বের। একাত্তরের ন’মাস ঝালকাঠি জেলার বিভিন্ন স্থানে পাক বাহিনী নির্মম গণহত্যা চলায়। এরমধ্যে ঝালকাঠি সদর উপজেলার পেয়ারা বাগান এলাকার বিলাঞ্চলে নির্মম হত্যাজজ্ঞে শহীদ হন কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষ । বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পেয়ারা বাগানে আশ্রয় নেয়া অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এসব বিলাঞ্চলের বিভিন্নস্থানে । স্থানীয়দের মতে বিলাঞ্চলের বধ্যভূতিগুলোতে কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে । ১৯৭১ সালের ৩ জুন সিরাজ সিকদার ভীমরুলি স্কুলে এক সভা করে পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন পার্টি বিলুপ্ত করে পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি গঠন করেন। এ সভায় হুমায়ুণ কবীর, সেলিম শাহ নেওয়াজ, বিপ্লব, মজিদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এ অঞ্চলে সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা প্রবল প্রতিরোধ ও দূর্গ গড়ে তোলেন। পেয়ারা ঘণ অরন্যে ছিলো তাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। সেই সাথে বরিশাল বিভাগের হাজার হাজার মানুষ এ বাগানে আশ্রয় নেয়। গ্রামের ভীমরুলি খালে পাকবাহিনীর সাথে সিরাজ সিকদারের বাহিনীর কাছে কয়েকটি যুদ্ধে পরাজিত হয় পাকবাহিনী। যদিও সেই পরজয়ের প্রতিশোধ নিতে ভীমরুলি সহ আশপাশের গ্রামে পাক বাহিনী পরে গণহত্যা চালায়, ধর্ষণ, লুট এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়।
যুদ্ধকালীন সময় সিরাজ সিকদারের ছদ্মনাম ছিল সালাম। তার দলের মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ছিলেন হুমায়ুণ কবীর, ফিরোজ কবীর, রেজায়ের ছত্তার ফারুক, মজিবুল হক মেহেদী, বিপ্লব, আসাদ, মজিদ, আনোয়ার এবং নীলু অন্যতম।
এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের ঝালকাঠির জেলার অন্যতম সংগঠক মোহাম্মদ আলী খান, আবদুল বারী, শাহজাহান আশ্রাব, এবিএম মর্তুজা আলী, অধ্যাপক সন্তোষ কুমার, ডা. লুৎফর রহমান, রোজউল করিম আজাদ মানিক, তার ভাই ছোট ভাই সাইদুল করিম রতন, মুক্তিযুদ্ধেদের বরিশাল নৌ কমান্ডো মাহফুজ আলম বেগ, শচীন কর্মকার, তোফাজ্জল হক চৌধুরী, জিএম কবীর, চুন্নু, সেন্টু, টিপু, স্বরাজ পাল, বরুণ পাল এবং ক্যাপটেন শাহ জাহান ওমরসহ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বস্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠকরা এখানে থেকেই আশ্রয় নিয়ে প্রশিক্ষণ ও প্রতিবোধের দূর্গ গড়ে তোলেন।
ডুমুরিয়া বধ্যভূমি: এ জেলার ৮/১০টি গ্রামে বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে পেয়ারার গহীন বাগান। শত বছর ধরে বানিজ্যিক ভাবে স্থানীরা এখানে পেয়ারা চাষ করে আসছে । স্থানীয় ভাষায় গ্রামগুলোকে বিলাঞ্চল বা পেয়ারা বিল বলা হয়। জেলা সদর উপজেলার কীর্ত্তিপাশা ইউনিয়নেটির হিন্দু অধূষিত এমন একটি গ্রাম ডুমরিয়া । একাত্তরের ১০ জুন এ গ্রামের পেয়ারা বাগান থেকে মোট ১৯ জনকে ধরে এনে ওই গ্রামেরই স্থানীয় একটি ক্লাবের কাছে খাল পাড়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এদের বেশির ভাগই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মানিক বাহিনীর সদস্য। ক্লাবটি এখনও আছে । কয়েক বছর আগে ক্লাব কর্তৃপক্ষ এখানে একটি শহীদ স্মৃতি ফলক নির্মান করেছে। স্থানীয় বিরেন রায়, শ্যামল হালদারসহ আরো কয়েকজন গ্রামবাসি জানিয়েছেন, এখানকার পেয়ারা বাগানে আশ্রয় নেয়া আরো অসংখ্য মানুষকে এ জায়গায় বিভিন্ন সময় হত্যা করা হয় ।
ভীমরুলি বধ্যভূমি: কীর্ত্তিপাশা ইউনিয়নের পেয়ারা বাগান ঘেরা ভীমরুলি গ্রাম । একাত্তরের ৭ জুন এ গ্রামের পেয়ারা বাগান থেকে স্থানীয় অনেককে ধরে এনে গ্রামের ভীমরুলি স্কুলের পিছনে খালের পাড়ে হত্যা করা হয়। যুদ্ধের ন’মাসে অসংখ্য নাম না জানা মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে এখানে এনে হত্যা করা হয় । এখানেও কোন স্মৃতি চিহ্ন রক্ষায় উদ্যোগ নেয়া হয়নি । মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তালিকায় এ জায়গাটির নাম রয়েছে ।
শতদশকাঠী বধ্যভূমি: একাত্তরের গণহত্যার নির্মম স্বাক্ষী শতদশকাঠী বধ্যভূমি । গ্রামের শতদশকাঠী সতীলক্ষী বালিকা বিদ্যালয়ে পাকবাহিনী ক্যাম্প তৈরি করে। পেয়ারা বাগানে পালিয়ে আসা অসংখ্য সাধারণ মানুষকে ধরে এনে বাংলা জৈষ্ঠ্য ও আষাঢ় মাসে বিদ্যালয়টির পিছনের পুকুর ও খাল পাড়ে হত্যা করা হয় । বর্তমানে বিদ্যালটির পুরাতন কূপ এবং পুকুরের মধ্যে অসংখ্য মানুষের হাড় ও মাথার খুলি পাওয়া যায় । এখানে আজও কোন স্মৃতি স্তম্ভ কিংবা শহীদের তালিকা তৈরি হয়নি । জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তালিকায় এ বধ্যভূমির নাম রয়েছে ।
জগদীশপুর বধ্যভূমি: জগদীশপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পিছনে একাত্তরের বাংলা জৈষ্ঠ্য ও আষাঢ় মাসে গণহত্যা চালায় পাকবাহিনী । এখানেও স্থানীয়দের সাথে পেয়ারা বাগানে আশ্রয় নেয়া অসংখ্য মানুষকে হাত বেঁধে লাইনে দাড় করিয়ে দিনের পর দিন হত্যা করা হয়। স্কুলের দেয়ালে সেই হত্যা চিহ্ন স্বাধীনতার পরও অনেকদিন ছিল । এ গ্রামের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা হিরালাল সমাদ্দার এ বধ্যভূমির কথা বলেন । ১৯৯৬ সালে স্থানীয়দের উদ্যোগে এখানে একটি শহীদ বেঁদি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু আর্থিক সংকটে সংস্কারের অভাবে আজ তা ভেঙে গেছে । জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তালিকাও এ স্থানটির নাম রয়েছে।
যোগাযোগ: সড়ক ও জলপথে দিনের ভেতরেই ঘুরে আসা যায় ঝালকাঠির ভাসমান হাট বা ফ্লোটিং মার্কেটে। ভীমরুলি গ্রামে প্রধান টার্গেট করে আশপাশের গ্রামগুলোও ঘুরে আসা যাবে খুব সহজেই। বাস বা লঞ্চে ঢাকা বা অন্য জেলা থেকে ঝালকাঠি আসতে হবে প্রথমে। এরপর সহজ সরল পথ। ঝালকাঠি শহরে পৌছে ফায়ার সার্ভিস মোড়ে আসতে হবে। সেখান থেকে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা খালের পাশের সরু রাস্তার পাশ দিয়ে নিয়ে যাবে ভীমরুলি হাটে। গ্রামের পথ ঘাট, পাখির ডাক, পেয়ারাসহ সবজি বোঝাই নৌকায় নৌকার যাতায়াত দেখতে দেখতে আধাঘন্টার মধ্যে পৌছে যাবেন ভীমরুলি হাটে। ট্রলার করে নদী পথেও ভীমরুলি হাটে আসা যাবে। যাদের হাতে বেশি বেশি সময় রয়েছে তারা শহরের কলেজ খেয়াঘাট বা পৌরসভা খেয়া ঘাটে এসে ট্রলার ভাড়া করে তিন-সাড়ে তিন ঘন্টায় দেখতে দেখতে পৌছে যাবেন ভীমরুলি হাটে।

লেখক: পলাশ রায়, সম্পাদক ঝালকাঠি সময়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Logo
সম্পাদক ও প্রকাশক : পলাশ রায়
১৪, রীডরোড, শহীদ স্মরণি, ঝালকাঠি ৮৪০০
ইমেইল : jhalokathisomoy@gmail.com
মুঠোফোন : ০১৭১২ ৫১ ৭৫ ৪৬
© All rights reserved © 2019
Developed BY : Website-open