২১ মার্চ, ২০১৯ খ্রি: ।। বৃহস্পতিবার ।। ৭ চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ।। নিবন্ধনের জন্য তথ্য মন্ত্রণালয় আবেদনকৃত অনলাইন পত্রিকা www.jhalokathisomoy.com

সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ছাড়া যে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ সাইটের তথ্য, ছবি বা ভিডিও প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবেন-সম্পাদক

নাগরিক সাংবাদিকতা এবং নাগরিকের দায়বদ্ধতা

সিটিজেন জার্নালিজম বা নাগরিক সাংবাদিকতা একটি বিদেশি সংস্কৃতি বা প্রচলন। এটি প্রথমে শুরু হয় প্রাশ্চ্যের দেশগুলোতে প্রযুক্তি সভ্যতার অগ্রযাত্রায় বিশেষ করে ইন্টারনেটের কল্যাণে। এখন বাংলাদেশেও এ সাংবাদিকতা ছড়িয়ে পড়েছে শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। নাগরিকগণ নিজেদের সুখ-দু:খ কিংবা খবরা-খবর অন্যের সাথে শেয়ার করতে শুরু করেন প্রথাগত সাংবাদিকতার বাইরে সামাজিক এ সাংবাদিকতা। একে জন-সাংবাদিকতাও বলা হয়। সমাজের অসঙ্গতি কিংবা সমস্যা সমাধানে পৃথিবী জুড়ে বিশেষ ভূমিকা রাখছে নাগরিক সমাজের এ সাংবাদিকতা। তৈরি করছে জনমত। গুগলের যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৮ সালে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক ২০০৪ সালে, টুইটার ২০০৬ সালে এবং অ্যাপলে-আই ফোন ২০০৭ সালে। ফেসবুক, টুইটার, ভাইবারসহ এখন নানা মাধ্যম নাগরিকগণের এ সাংবাদিকতার জনপ্রিয় প্লাটফর্ম। বর্তমানে নাগরিক জীবনে স্মার্টফোন নাগরিক সাংবাদিকতাকে করেছে দূরন্ত গতীর সেই সাথে এনেছে বিপর্যয়ও।
আসলে নাগরিক সাংবাদিকতার প্রধান উদ্দেশ্য সচেতন নাগরিক তার নিজের জ্ঞান ও সৃজনশীলতা সমাজের প্রয়োজনে তুলে ধরবেন। এখানে সাংবাদিকতার কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই অনলাইন ভিত্তিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে কেউ তার চারপাশের ঘটে যাওয়া ঘটনা, বিষয় বা নিজস্ব মতামত কিংবা সঠিক তথ্য-উপাত্ত লেখা, তথ্যচিত্র, ক্ষুদেবার্তা, অডিও, ভিডিও বা অন্য কোনো ভাবে জনস্বার্থে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার বা প্রকাশ করে থাকেন। তবে তা জনস্বার্থে এবং মানুষের কল্যাণেই তার একমাত্র উদ্দেশ্য হতে হবে। বাংলাদেশে ২০০৫ সালে নাগরিক সাংবাদিকতার চর্চা শুরু হয়। মুক্তমনাসহ অনেকগুলো ব্লগে নাগরিকগণ শুরু করেন নাগরিক সাংবাদিকতার চর্চা। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমসহ পাঠকের মতামতকে গুরুত্বের সাথে তুলে ধরে নাগরিক সাংবাদিকতার প্লাটফর্ম তৈরি করেন অনেক গণমাধ্যমও। দৈনিক পত্রিকাগুলোতেও রয়েছে চিঠিপত্র ও মতামত কলাম। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকই এখন তরুণ প্রজন্মসহ নাগরিক সাংবাদিকতায় সবার কাছে প্রধান মাধ্যম।
যদি প্রশ্ন করা হয় নাগরিক সাংবাদিকতা কী? তবে সহজে বলা যায়-স্বতস্ফূর্ত ও স্বপ্রণোদিত হয়ে গণমানুষের খবররা খবর বা তথ্য সংগ্রহ, পরিবেশন, বিশ্লেষন এবং প্রচার প্রচারণায় অংশ নেয়াই হচ্ছে সিটিজেন জার্নালিজম বা নাগরিক সাংবাদিকতা। তবে এ জাতীয় সাংবাদিকতার কোন প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, পরিচয় নেই। স্বপ্রণোাদিত হয়ে প্রযুক্তি বা ইন্টারনেট ব্যবহার করে সাধারণ জনগণ জনস্বার্থে যে সব তথ্যের আদান প্রদান করে থাকেন তাই নাগরিক সাংবাদিকতা। নাগরিকগণকে এ সাংবাদিকতা চর্চায় প্রথমেই যে বিষয়গুলো মেনে চলতে হবে তা হলো, মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কোনো তথ্য-উপাত্তের প্রচার বা প্রকাশ থেকে বিরত থাকা। জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণি নির্বিশেষে প্রত্যেকের নিজস্ব বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। ইচ্ছাকৃত বা উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ব্যক্তির মর্যাদাহানীকর কোনো বিষয় প্রচার থেকে সম্পূর্ন বিরত থাকা। নিজের বিবেকলব্ধ দায়িত্বশীল আচরণ করা এবং সর্বপরি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে স্বাধীন মত প্রকাশ করাই নাগরিক সাংবাদিকতার একমাত্র উদ্দেশ্য।
গত কয়েক বছর ধরে নাগরিক সাংবাদিকতার মাধ্যম ফেসবুক হয়ে উঠেছে অনেকটা বিপদজনক। মোবাইল ফোনে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় মিথ্যা খবর ছড়িয়ে পড়ছে। বিভ্রান্ত হচ্ছে নাগরিক সমাজ। অনেক সময় মিথ্যা খবর ঠেকাতে কিংবা তার প্রভাব মুক্ত করতে হিমসীম খেতে হয় রাষ্ট্রকেও। সম্প্রতি ছাত্র আন্দোলনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের প্রচারণায় তার প্রমান সবাই দেখতে পেয়েছেন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত না হয়েও অনেকে আবার যাচাই-বাচাই না করেই অনেক খবর ছড়িয়ে দেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কিন্তু খারাপ উদ্দেশ্য না থাকলেও তার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে ব্যক্তি, সমাজ বা রাষ্ট্র মুক্তি পায় না। আবার অনেক সত্য ঘটনা বা খবারের ছবি কিংবা ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়াও জনমনে বিরক্তি, ভয় বা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কারণ হয়ে ওঠে। এমন বেশ কিছু উদাহরণ থেকে মাত্র একটি ঘটনা তুলে ধারা যাক। সড়ক দুর্ঘটনায় ১০ জন নিহত হলেন। আর সেই দুর্ঘটা কবলিত মানুষের রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত ছবি বা ভিডিও নাগরিক সাংবাদিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করলেন। কিন্তু ছবির বিভৎতা শিশু, বৃদ্ধা কিংবা হৃদয়বান মানুষের মনে মারাত্মক ক্ষতির প্রভাব ফেলতে পারে। সেই ছবি দেখে হতে পারে মৃত্যুরও কারণ। এ ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষদর্শী নাগরিক সাংবাদিকগণ ছবি ছাড়াই কিংবা কেবল দুর্ঘটনা কবলিত যান-বাহন বা গণমানুষের ভীড়ের ছবি দিয়েই ঘটনাটি তুলে ধরতে পারেন। আর জনমত তৈরিতে, কিংবা কোন অসংগতির বিরুদ্ধে বা প্রতিকার পেতে নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারেন মার্জিত ভাষায়। আসলে নাগরিকের এ সাংবাদিকতায় বিশেষজ্ঞ, জড়িত ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান আবার অনেক সময় সরেজমিন পর্যাবেক্ষন ছাড়াই ব্যক্তির অভিমত বা তথ্য ছবি দিয়ে খবরকে তুলে ধরা হয়। তাই সবচে আগে প্রয়োজন বিবেক-বিবেচনায় বারবার যাছাই-বাছাই করে প্রচার প্রচারণায় যাওয়া। আসলে সবার উপলব্ধি করতে হবে প্রথাগত সাংবাদিকতার চেয়েও নাগরিক সাংবাদিবতায় ব্যক্তির দায়বদ্ধতা অনেক বেশি। কারণ এখানে একজন নাগরিক সাংবাদিক নিজেই বিশেষজ্ঞ, নিজেই প্রতিষ্ঠান, নিজেই তুলে ধরেন নিজের অভিমত। তবে তা যদি হয় উদ্দেশ্য প্রণোদিত কিংবা রাজনৈতিক হাতিয়ার তবে ভোগাবে পুরো নাগরিক সমাজকে।

লেখক: পলাশ রায়
সম্পাদক ঝালকাঠি সময়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2019
Theme Developed BY : AKHTERUJJAMAN